রাজনৈতিক চাপে পড়লেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি পুরোনো কৌশল ব্যবহার করেন—কোনো নতুন লড়াইয়ের সৃষ্টি করা বা প্রতিপক্ষ খুঁজে বের করা। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে একের পর এক ভুল সিদ্ধান্ত ও সমালোচনার মুখে পড়ে শুক্রবারও তিনি সেই পথেই হাঁটলেন। এর অংশ হিসেবেই নিউইয়র্কের নবনির্বাচিত মেয়র জোহরান মামদানিকে হোয়াইট হাউসে আমন্ত্রণ জানান তিনি।
ট্রাম্প দাবি করেছেন, বৈঠকের আগ্রহ দেখিয়েছিলেন মামদানিই। স্থানীয় সময় বিকেল তিনটায় (বাংলাদেশ সময় রাত ২টা) নির্ধারিত এই সাক্ষাৎকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে—বিশেষ করে মেয়র নির্বাচনের সময় মামদানির বিরুদ্ধে ট্রাম্পের তীব্র বক্তব্যের কারণেই কৌতূহল আরও বেড়েছে।
ট্রাম্পের সাম্প্রতিক সংকট
গত কয়েক দিনে ট্রাম্প নানা সমস্যায় জর্জরিত। রিপাবলিকান পার্টির ওপর তাঁর দীর্ঘদিনের প্রভাব দুর্বল হয়ে আসছে—এমন শঙ্কা বাড়ছে। কুখ্যাত যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টেইন ইস্যুতে তাঁর একের পর এক ভুল প্রতিক্রিয়া তাঁকে আরো বিপাকে ফেলেছে। আবার জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে সহানুভূতি দেখানোর চেষ্টাও জনমানসে উল্টো হাস্যরসের জন্ম দিয়েছে।
এ অবস্থায় নতুন সংঘাত তৈরি করে রাজনৈতিক আলো নিজের দিকে টেনে আনা তাঁর কাছে কার্যকর কৌশল বলেই মনে হয়েছে। আর সুযোগও পেয়েছেন একটি ভাইরাল ভিডিও থেকে—যেখানে কয়েকজন ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতা সেনাসদস্যদের অবৈধ আদেশ না মানার পরামর্শ দিয়েছেন। ট্রাম্প এই ঘটনাকে “রাষ্ট্রদ্রোহ” আখ্যা দিয়ে এর শাস্তি মৃত্যুদণ্ড হওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেছেন।
এই মন্তব্যে ট্রাম্প–ডেমোক্র্যাট দ্বন্দ্ব আরও তীব্র হয়েছে। ভিডিওতে থাকা ডেমোক্র্যাট সদস্য ক্রিসি হলাহ্যান বিস্ময় প্রকাশ করে বলেছেন, ‘‘আমি ভাবতেই পারছি না যে শুধু আইন মানার কথা বলায় প্রেসিডেন্ট আমাকে মৃত্যুদণ্ডের কথা বললেন।’’
কেন এই লড়াই–কৌশল?
সাধারণ রাজনৈতিক নিয়মে এমন আচরণ কারও ক্যারিয়ার ধ্বংস করে দিতে পারে। কিন্তু ট্রাম্প উল্টো এই সংঘাতগুলোকে নিজের পক্ষে ব্যবহার করেন। রক্ষণশীল গণমাধ্যম তাঁর হয়ে প্রচারণা চালায়, সমর্থকেরা তাঁর পাশে জড়ো হয়—ফলে বড় সংকটগুলো থেকে জনমত সরে যায়। ওবামার বিরুদ্ধে বর্ণবাদী প্রচারণা, সেনেটর ম্যাককেইনকে নিয়ে বিদ্রূপ, কিংবা ২০২০ নির্বাচনের মিথ্যা দাবি—সবই তাঁকে জনপ্রিয় রাখতে সহায়তা করেছে।
তবে এখন প্রশ্ন—অর্থনৈতিক চাপ ও ক্রমহ্রাসমান সমর্থনের সময়ে এই কৌশল কতটা কার্যকর হবে?
মামদানি–বৈঠক: নতুন সংঘাতের মঞ্চ
হোয়াইট হাউসে মামদানির সঙ্গে বৈঠকও মূলত সেই রাজনৈতিক নাটকের অংশ। ট্রাম্পের বিভিন্ন ভুলের দৃষ্টি অন্যদিকে সরাতে মামদানিকে আক্রমণ করার সম্ভাবনা প্রবল। দুজনই নিউইয়র্কের রাজনীতিতে প্রভাবশালী হলেও বয়স ও প্রজন্মগত ব্যবধানে পরিষ্কার পার্থক্য আছে—৭৯ বছর বয়সী ট্রাম্পের রাজনৈতিক অধ্যায় প্রায় শেষের দিকে, আর ৩৪ বছর বয়সী মামদানি তরুণদের মধ্যে দারুণ জনপ্রিয়।
ট্রাম্প ইতোমধ্যে মামদানিকে ‘কমিউনিস্ট মেয়র’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে সব ডেমোক্র্যাটকে ‘চরমপন্থী’ রূপে চিত্রিত করতে চাইছেন। যদিও মামদানি নিজেকে গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রী বলে পরিচয় দেন। এমনকি তাঁর নাগরিকত্ব নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন ট্রাম্প।
মামদানির বড় পরীক্ষা
আজকের বৈঠক মামদানির জন্য বড় পরীক্ষা বলেই মনে করা হচ্ছে। অতীতে হোয়াইট হাউসে ডেকে অতিথিদের সামনে অপমান করার নজির আছে—ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির ঘটনা তার বড় উদাহরণ। তাই মামদানির জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—প্রমাণ করা যে তিনি ট্রাম্পের চাপের সামনে দাঁড়াতে পারেন এবং নিউইয়র্কের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক লড়াই মোকাবিলায় সক্ষম।