বাংলাদেশ সীমান্তের কাছে ‘চিকেনস নেক’ হিসেবে পরিচিত শিলিগুড়ি করিডোর ঘিরে ভারতের সামরিক তৎপরতা নিয়ে সাম্প্রতিক আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। আসাম ও উত্তর দিনাজপুরের সীমান্ত সংলগ্ন এলাকায় দুটি নতুন সেনা ঘাঁটি স্থাপনের কাজ শুরু করেছে দেশটি। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, শিলিগুড়ি করিডোরের কৌশলগত গুরুত্ব এবং আঞ্চলিক স্থিতির পরিবর্তনই ভারতের এই উদ্যোগের মূল কারণ।
ভারতীয় বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সেভেন সিস্টার্স অঞ্চলকে ভারতের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত রাখা এবং চীনের প্রভাব বৃদ্ধিকে ঠেকানো—এই দুই উদ্দেশ্যেই করিডোরে সক্ষমতা বাড়ানো হচ্ছে। চীনের সিপ্যাক ও সিম্যাক করিডোর এবং ডোকলাম অঞ্চলজুড়ে উত্তেজনার প্রেক্ষাপটও এতে প্রভাব ফেলছে।
এদিকে ভারতের এ তৎপরতার মাঝে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়ানো হয়েছে লালমনিরহাট সীমান্তের ৬২ কিলোমিটার ‘ভারতের দখলে’ চলে গেছে—এমন বিভ্রান্তিকর তথ্য। তবে লালমনিরহাটে সরেজমিন পরিদর্শনের পর বিজিবি জানিয়েছে, এ তথ্য পুরোপুরি গুজব এবং সীমান্ত পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। বিজিবির লেফটেন্যান্ট কর্নেল মেহেদী ইমাম বলেন, সীমান্তে কোনো ধরনের অস্বাভাবিক সমাবেশ বা অনুপ্রবেশ তারা দেখেননি। বিএসএফের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ও যৌথ টহলও বজায় রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিজ্ঞতাও একই—জমি বা বসতভিটা দখল হওয়ার ঘটনা নেই। তবে ৫ আগস্টের পর থেকে বিএসএফের টহল ও নজরদারি কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে বলে তারা জানান। সীমান্তে মাঝে মাঝে গুলির ঘটনা ঘটলেও সার্বিক পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে।
ভারত সীমান্তের কাছে ধুবরি ও চোপরায় দুই নতুন আর্মি স্টেশন নির্মাণ করছে। অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল দীপঙ্কর ব্যানার্জীর মতে, এগুলো ‘ক্যাপাসিটি র্যাশনালাইজেশন’ প্রচেষ্টার অংশ এবং বাংলাদেশকে লক্ষ্য করে নয়। তার ভাষায়, “এটি অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা প্রস্তুতি, বিশেষ করে চীনকে বিবেচনায় রেখে।”
অন্যদিকে বাংলাদেশি বিশ্লেষক অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল নাঈম আশফাক চৌধুরী মনে করেন, এই সামরিক পদক্ষেপের পেছনে তিনটি কারণ উল্লেখযোগ্য—শিলিগুড়ি করিডোরের নিরাপত্তা জোরদার, চীনের প্রভাব প্রতিহত করা এবং বাংলাদেশে ৫ আগস্ট পরবর্তী রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে ভারতের শঙ্কা। তিনি মনে করেন, তিস্তা প্রকল্পে চীনের দীর্ঘমেয়াদি উপস্থিতির সম্ভাবনাও ভারতের উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
তিনি বলেন, সীমান্তের কাছে সামরিক সক্রিয়তা ভারতের “গ্রে জোন ব্যাটল”—যা সরাসরি যুদ্ধ নয়, তবে কৌশলগত চাপ তৈরি করে। এতে বাংলাদেশের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলতে চায় ভারত—এমন বিশ্লেষণও উঠে এসেছে।
তারপরও বাংলাদেশের বিরুদ্ধে কোনো সামরিক প্রস্তুতি চলছে—এমন ইঙ্গিত মেলে না বলে জানান এই নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ। তবে তিনি পরামর্শ দেন—বাংলাদেশকে সামরিক কূটনীতি ও সীমান্ত সহযোগিতা আরও জোরদার করতে হবে।
ভারতীয় নিরাপত্তা বিশ্লেষক দীপঙ্কর ব্যানার্জীর ভাষায়, “বাংলাদেশ থেকে সামরিক হুমকি হওয়ার প্রশ্নই আসে না। তবে দীর্ঘ সীমান্তের কৌশলগত গুরুত্ব বিবেচনায় পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে ভারত প্রস্তুতি নিচ্ছে।”
বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্কের সাম্প্রতিক টানাপোড়েন, সীমান্তে বাড়তি নজরদারি এবং শিলিগুড়ি করিডোরের জিও–স্ট্র্যাটেজিক গুরুত্ব—সব মিলিয়ে সীমান্ত এলাকায় চলমান তৎপরতা নিয়ে দুই দেশেই বিশ্লেষণ ও আলোচনা বাড়ছে।