‘চট্টগ্রাম বন্দর বিদেশিদের হাতে দেওয়ার সিদ্ধান্ত আত্মঘাতী’

চট্টগ্রাম বন্দর বিদেশি অপারেটরের কাছে হস্তান্তর–সংক্রান্ত সাম্প্রতিক দুই চুক্তির তীব্র বিরোধিতা জানিয়েছেন চট্টগ্রামের ১০ বিশিষ্ট নাগরিক। তাঁদের মতে, একটি অন্তর্বর্তী সরকারের এ ধরনের রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ ও দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্ত নেওয়ার সাংবিধানিক বা নৈতিক এখতিয়ার নেই। দ্রুততার সঙ্গে চুক্তি সম্পাদনের ঘটনা জাতির মনে গুরুতর সন্দেহ সৃষ্টি করেছে, যা তাঁদের ভাষায় “আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত”।

বৃহস্পতিবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে তাঁরা বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর জাতীয় সম্পদ—এটি পরিচালনায় বিদেশি কোনো প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দেওয়ার আগে বিষয়টি জাতির সামনে স্বচ্ছভাবে উপস্থাপন করা উচিত ছিল। তাঁরা মনে করিয়ে দেন, অতীতেও জনগণের বিরোধিতা উপেক্ষা করে বন্দর ব্যবস্থাপনা বিদেশির হাতে দেওয়া হয়েছিল; পরবর্তীতে জনরোষের মুখে সিদ্ধান্তটি প্রত্যাহার করতে হয়।

বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, সম্প্রতি লালদিয়া চরে নতুন টার্মিনাল নির্মাণ ও পরিচালনার জন্য ডেনমার্কভিত্তিক এপিএম টার্মিনালসের সঙ্গে ৩৩ বছরের চুক্তি (যা আরও ১৫ বছর বাড়ানো যেতে পারে) এবং একই দিনে কেরানীগঞ্জের পানগাঁও নৌ টার্মিনাল পরিচালনার জন্য সুইজারল্যান্ডের মেডলগ এসএর সঙ্গে ২২ বছরের চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে। এসব কনসেশন চুক্তি তৈরিতে সরকারের পরামর্শক হিসেবে কাজ করছে বিশ্বব্যাংকের সহযোগী প্রতিষ্ঠান আইএফসি।

বিশিষ্টজনেরা প্রশ্ন তুলেছেন—আইএফসির ট্রানজেকশন অ্যাডভাইজরি প্রতিবেদনে সম্পূর্ণ প্রক্রিয়ার জন্য ৬২ দিন সময় নির্ধারিত থাকলেও চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ কীভাবে মাত্র দুই সপ্তাহে চুক্তি চূড়ান্ত করল। তাঁদের মতে, এই অস্বাভাবিক তাড়াহুড়া জনমনে সন্দেহ আরও বাড়িয়েছে।

তাঁরা আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার উদাহরণ টেনে বলেন, অসতর্ক চুক্তির কারণে বহু দেশকে বিপুল ক্ষতিপূরণ গুনতে হয়েছে। জিবুতির উদাহরণ দিতে গিয়ে তাঁরা জানান, ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে ২০০৪ সালে করা চুক্তি বাতিল করায় দেশটিকে আন্তর্জাতিক আদালতের রায়ে সুদসহ ৩৮৫ মিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ এবং আরও ১৪৮ মিলিয়ন ডলার স্বত্ব বাবদ পরিশোধে বাধ্য হতে হয়। এমন নজির বিশ্বের বিভিন্ন দেশেই রয়েছে।

বিবৃতিদাতারা জানতে চান—চুক্তির টার্মিনেশন, ক্ষতিপূরণ এবং আর্থিক শর্ত গোপন রাখা হলো কেন। তাঁরা এসব শর্ত প্রকাশ করার জন্য সরকারের কাছে জোর দাবি জানান।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল দেশীয় জনবল দিয়েই লাভজনকভাবে পরিচালিত হচ্ছে এবং বর্তমানে এটি নৌবাহিনীর অধীনে। সেখানে নতুন কোনো বিনিয়োগের প্রয়োজন নেই। তাহলে লাভজনকভাবে চলমান এ টার্মিনালটিই বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে কেন তুলে দেওয়া হচ্ছে?

তাঁদের মতে, চালু টার্মিনালগুলো বিদেশি কোম্পানির হাতে ছেড়ে দিলে দেশীয় কোনো প্রতিষ্ঠানই ভবিষ্যতে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারবে না। বন্দর খাতে নিজের সক্ষমতা তৈরির সুযোগও হারিয়ে যাবে। মাশুল বৃদ্ধি বা সংকটের সময় দেশীয় বিকল্প ব্যবস্থাপনার যে সুযোগ থাকা উচিত, বিদেশি নিয়ন্ত্রণে তা আর অবশিষ্ট থাকবে না—যা জাতীয় নিরাপত্তা ও অর্থনীতির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।

অন্তর্বর্তী সরকারের ক্ষমতা প্রসঙ্গে বিবৃতিতে বলা হয়, বন্দর পরিচালনার মতো দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থ জড়িত সিদ্ধান্ত কেবল একটি নির্বাচিত সরকারই নিতে পারে। ফেব্রুয়ারির মধ্যে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকায় এর আগেই এমন চুক্তি সম্পাদনকে তাঁরা অযৌক্তিক ও অগ্রহণযোগ্য বলে দাবি করেন।

বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেন—কবি, প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক আবুল মোমেন; অর্থনীতিবিদ ড. মইনুল ইসলাম; লেখক ফেরদৌস আরা আলীম; নাট্যজন শিশির দত্ত; কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক বিশ্বজিৎ চৌধুরী; কবি ওমর কায়সার; কবি কামরুল হাসান বাদল; লেখক ও উন্নয়ন ব্যক্তিত্ব কমল সেনগুপ্ত; ভাস্কর অলোক রায় এবং আইবি চট্টগ্রাম কেন্দ্রের সাবেক চেয়ারম্যান দেলোয়ার মজুমদার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Exit mobile version