কয়েক দশকের মধ্যে দেশের সবচেয়ে প্রাণঘাতী ভূমিকম্পে মৃত্যু বেড়ে ১০ জনে দাঁড়িয়েছে, ছয়শ ছাড়িয়েছে আহতের সংখ্যা। শুক্রবার ছুটির দিন সকালে ১০টা ৩৮ মিনিটের এ ভূমিকম্পে মাত্রা রিখটার স্কেলে ছিল ৫ দশমিক ৭; উৎপত্তিস্থল ছিল ঢাকার পাশে নরসিংদীর মাধবদীতে। ২৬ সেকেন্ড স্থায়ী এ ভূমিকম্পে প্রাথমিকভাবে আতঙ্ক ছড়ায়, বাড়িঘর ছেড়ে রাস্তায় নেমে আসেন মানুষ। এরপর আসতে থাকে প্রাণহানি আর ক্ষয়ক্ষতির তথ্য। সবশেষ খবর অনুযায়ী, ঢাকায় ৪ জন, নরসিংদীতে ৫ জন এবং নারায়ণগঞ্জে একজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। ঢাকা জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, ভূমিকম্পে আহত হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৫৯ জন এবং মিটফোর্ড হাসপাতালে ১৩ জন চিকিৎসা নিয়েছেন। রাতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ পরিদর্শক মো. ফারুক বলেছেন, আহতদের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষার্থীসহ ৫ জন চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এছাড়া ঢাকার বংশাল, মাতুয়াইল, খিলগাঁও, হাতিরঝিল, কলাবাগান ও নিউমার্কেট এলাকার কয়েকটি ভবন এবং ঢাকা কলেজের একটি হল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার তথ্য পাওয়ার কথা এক বার্তায় বলেছে জেলা প্রশাসন। ঢাকার বাইরে গাজীপুর, নরসিংদী ও নারায়ণগঞ্জ মিলে আহত হয়েছেন পাঁচ শতাধিক মানুষ। গাজীপুরের সিভিল সার্জন মো. মামুনুর রহমান বলেন, জেলায় মোট ৪০০ জন আহত হয়েছেন। এর মধ্যে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৮৬ জন, ছোটখাটো আঘাত নিয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন ৯৭ জন। টঙ্গীতে চিকিৎসা পেয়েছেন ৯০ জন। ‘গুরুতর’ আহত ৪৩ জনকে ঢাকায় স্থানান্তর করা হয়েছে বলেও জানান সিভিল সার্জন। বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ভূখণ্ডে ৮ মাত্রার ভূমিকম্পেরও ইতিহাস রয়েছে। তবে গত কয়েক দশকের মধ্যে এমন প্রাণঘাতি ভূমিকম্প দেশের মানুষ আর দেখেনি। ভূতত্ত্ববিদ অধ্যাপক সৈয়দ হুমায়ুন আখতার বলেন, “দুটো প্লেটের সংযোগস্থলে এ ভূমিকম্পটি হয়েছে, ইন্দো-বার্মা টেকটোনিক প্লেটে। ভূমিকম্পের কম্পনের তীব্রতা ছিল বেশ। প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।” এক বার্তায় প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস ভূমিকম্পে হতাহতের জন্য শোক প্রকাশের পাশাপাশি জনগণের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছেন। হতাহতের চিত্র ফায়ার সার্ভিস বলেছে, আরমানিটোলার কসাইটুলি এলাকার একটি ৮ তলা ভবনের পাশের দেয়াল এবং কার্নিশ থেকে ইট ও পালেস্তারা খসে নিচে পড়ে, যেখানে একটি গরুর মাংস বিক্রির দোকান ছিল। সেখানে থাকা ক্রেতা ও পথচারীরা আহত হন। ফায়ার সার্ভিস ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগেই স্থানীয় লোকজন তাদের হাসপাতালে নিয়ে যান। হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসকরা তিনজনকে মৃত ঘোষণা করেন। বংশাল থানার ওসি রফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, নিহতরা হলেন আনুমানিক ২২ বছর বয়সী রাফিউল ইসলাম, হাজী আবদুর রহিম (৪৭) ও তার ছেলে মেহরাব হোসেন রিমন (১২)। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিকসমুহ) আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান জানান, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র ছিলেন রাফিউল ইসলাম। ঢাকার মুগদা এলাকায় ভূমিকম্পে নির্মাণাধীন একটি ভবনের ছাদের রেলিং ধসে ওই ভবনেরই এক নিরাপত্তাকর্মীর মৃত্যু হয়েছে। মুগদা থানার পরিদর্শক মো. আসাদুজ্জামান বলেছেন, ওয়াসা রোডের নির্মাণাধীন একটি ভবনের নিরাপত্তাকর্মী ছিলেন ৫০ বছর বয়সী মাকসুদ। ভূমিকম্পের সময় তিনি ভবনের উপরে ছিলেন, ভয় পেয়ে দৌড়ে নিচে নেমে আসেন। বাইরে আসার পরপরই ওই ভবনেরই ছাদের রেলিং ভেঙে পাশের ভবনের উপর পড়ে, সেখান থেকে মাথায় পড়ে গুরুতর আহত হন মাকসুদ। পরে মুগদা হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। নারায়ণগঞ্জে একজন ছাড়াও নরসিংদীতে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে ৫ জনে দাড়িয়েছে। নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার একটি ভবনের দেয়াল ধসে দশ মাস বয়সী এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। রূপগঞ্জ থানার ওসি তরিকুল ইসলাম বলেন, “শুক্রবার সকালে উপজেলার গোলাকান্দাইল এলাকায় এ ঘটনায় শিশুটির মাসহ আরও দুজন আহত হন।” নিহত শিশু ফাতেমা ওই এলাকার আব্দুল হকের মেয়ে; তিনি ঢাকার শ্যামবাজারে ব্যবসা করেন। সদর উপজেলার চিনিশপুর ইউনিয়নের গাবতলি এলাকায় নির্মাণাধীন ভবনের দেয়াল থেকে ইট ধসে পাশের বসতবাড়ির ছাদের ওপর আছড়ে পড়ে। এতে বাড়ির সানশেড ভেঙে দেলোয়ার হোসেন উজ্জ্বল, তার ছেলে মো. ওমর ও দুই মেয়ে আহত হয়। তাদেরকে প্রথমে নরসিংদী সদর হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকরা প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে আশঙ্কাজনক অবস্থায় বাবা ও ছেলেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠান। সেখানে নিয়ে গেলে ওমরকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসক। বাবা দেলোয়ার হোসেনকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান বলে জানিয়েছেন হাসপাতালের পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ পরিদর্শক মো. ফারুক। এদিকে ভূমিকম্পের সময় মাটির ঘরের দেয়াল ধসে প্রাণ হানিয়েছে নরসিংদীর পলাশ উপজেলার মালিতা পশ্চিমপাড়া গ্রামের কাজেম আলী ভূইয়া (৭৫)। তাকে প্রথমে পলাশ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। সেখান থেকে নরসিংদী ১০০ শয্যা বিশিষ্ট জেলা হাসপাতালে নেওয়ার পথে তিনি মারা যান বলে জানান উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) আব্দুল্লাহ আল মামুন। অপরদিকে শিবপুর মডেল থানার ওসি মো. আফজাল হোসাইন বলেন, ভূমিকম্পের সময় গাছ থেকে পড়ে গুরুতর আহত হন আজকীতলা পূর্বপাড়া গ্রামের শরাফত আলীর ছেলে ফোরকান মিয়া (৪৫)। তাকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে সেখানে তিনি মারা যান। এ ছাড়া ভূমিকম্পের সময় আতঙ্কে হৃদরোগে আক্রান্ত হন ৬৫ বছরের নাসির উদ্দিন। তিনি কাজীরচর নয়াপাড়া গ্রামের মৃত সিরাজ উদ্দিনের ছেলে। স্থানীয়দের বরাতে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আনোয়ার হোসাইন বলেন, ভূমিকম্পের সময় ফসলী জমি থেকে আতঙ্কিত হয়ে দৌড়ে আসার পথে হৃদরোগে আক্রান্ত হন নাসির উদ্দিন। রাস্তা থেকে নিচে পড়ে ঘটনাস্থলেই তাৎক্ষণিক মৃত্যুবরণ করায় নিকটাত্মীয়রা তার লাশ হাসাপাতালে নেননি